09-08-2025

শিক্ষাখাতে ভয়ঙ্কর রাষ্ট্রীয় গলদের কাহিনী

সরকারি সহায়তাবঞ্চিত ৭৪ শতাংশ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশের শিক্ষাখাতে বেসরকারি উদ্যোগের অংশীদারি ক্রমে বাড়লেও সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়েছে এসব প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ( বিবিএস) পরিচালিত ’ বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জরিপ ২০২৪’ বলছে, দেশের মোট ৯২ হাজার ৩৯২টি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ২৬হাজার ১০৪টি এমপিওভুক্ত। অর্থাৎ সরকারি মাসিক পে-অর্ডারের আওতায় ।

বাকি ৭৪শতাংশের বেশি প্রতিষ্ঠান সরকার ঘোষিত আর্থিক সহায়তা থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালাতে গিয়ে শিক্ষক- শিক্ষাকর্র্মীদের পড়তে হচেছ নানা আর্থিক সংকটে।

মাস শেষে বেতন না পেয়ে পরিবার চালানোই দু:সাধ্য হয়ে পড়ে তাদের জন্য। ফলে ইচেছ থাকা সত্ত্বেও মানসম্পন্ন শিক্ষা দেয়ার পরিবেশ ও সামর্থ্য অর্জন করা সম্ভব হয়না। শিক্ষাবিদ ও বিশ্লেষকরা বলছেন সরকারের পক্ষ থেকে বিনিয়োগ বা নজরদারির অভাবে এই খাতটি কার্যত নিজের গতিতে চলছে।

পাকিস্তান আমলে এবং স্বাধীনতার পরও বেশ কয়েক বছর যাবত দেশের জেলা স্কুলগুলো ছিল শিক্ষার মডেল। তখন এতো সংস্থাপরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিলনা। ছিলনা এত এত ক্যান্টনমেন্টে বোর্ড স্কুল, পাবলিক স্কুল এবং পাকিস্তান আমলে প্রতিষ্ঠিত ছিল ক্যাডেট কলেজ ছিল মাত্র চারটি ( ফৌজদারহাট, ঝিনাইদহ, মির্জাপুর এবং রাজশাহী) এবং সেগুলোতে ব্যতিক্রম ছাড়া সাধারনের প্রবেশ খুব একটা ছিলনা।

স্বাধীনতার পর প্রতিটি ক্ষেত্রেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ধরন, ম্যানেজমেন্ট এবং শিক্ষাদান পদ্ধতিতে পরিবর্তন এসেছে আর তাই এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা একটু ভিন্ন ধরনের শিক্ষায় শিক্ষিত হতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে জেলা স্কুলগুলো তাদের সেই ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলে। অথচ জেলাস্কুলগুলোর শিক্ষা ছিল ক্রিয়েটিভ, শিক্ষকগন ছিলেন জ্ঞানের আধার, নিবেদিনপ্রাণ, বাণিজ্যিকভাবে প্রাইভেট পড়ানোর রমরমা ব্যবসা এখনকার মতো জেঁকে বসেনি। তারা যা পড়াতেন তা ছিল প্রকৃতঅর্থেই ‘সলিড টিচিং’ আর শিক্ষার্থীরা যা গ্রহন করতেন তা ছিল ‘সলিড লার্নিং’। সাম্প্রতিক সময়ের ক’বছর আগ পর্যন্ত সমাজে এবং রাষ্ট্রীয় বড় বড় প্রতিষ্ঠানে যারা বড় বড় পদে ছিলেন দেখা যায় তাদের অধিকাংশই জেলা স্কুল থেকে আসা।

প্রয়োজনের তাগিদে দেশে বিভিন্ন শিল্প কারখানা স্থাপিত হয়েছে, ক্যান্টনমেন্ট স্থাপিত হয়েছে আর তাই ঐসব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা কর্মচারীদের সন্তানদের শিক্ষার জন্য বিশেষ ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি করা হয়েছে, সেই সাথে আশপাশের মানুষেরও অনেকটা সুবিধা হয়েছে। সাথে সাথে বেসরকারি পর্যায়েও বড় বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি হতে শুরু করলো।

এভাবে শিক্ষার বেসরকারীকরণ ব্যবস্থা গতিলাভ করলো। এখন এটা একটা বিরাট বাস্তবতা। কারণ বেসরকারি বা সংস্থা পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়ম শৃংখলা ও তদারকি ভিন্ন মাত্রার বলে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে যেসব শিক্ষার্থীরা পাস করেন তাদের একাডেমিক ও কো-কারিকুলার কার্যাবলীতে দক্ষতা থাকে অনেক বেশি। তাই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের সুযোগ সুবিধা বেশি থাকা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু হয়েছে উল্টো।

ফলে যেটি হয়েছে সবাই সরকারিতে চাকরি করতে চান কারণ জবাবদিহিতা কম, নিয়মিত বেতন ও রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা প্রাপ্তি। বেসরকারি শিক্ষকরা তাই নিজেদের আখের গোছানোর জন্য প্রাইভেট টিউশন, কোচিংসহ অন্যান্য বাণিজ্যিক কার্যাবলী চালিয়ে যাচেছন। আমি নিজে বেসরকারি শিক্ষক ও প্রাইভেট পড়ানোর রাজার মুখে শুনেছি ‘আমাদের যেহেতু পেনশন নেই, তাই পেনশন নিজেরাই বানাচিছ।’ এটি একটি রাষ্ট্রীয় গলদ! এখানে প্রচুর কাজ করার কথা কিন্তু করবে টা কে? একমাত্র রাজনীতিবিদ যারা দেশ পরিচালনা করেন তাদের করার কথা ছিল কিন্তু তাদের এসব নিয়ে চিন্তা করার সময়, সুযোগ ও প্রয়োজন কোনোটাই নেই। তাই শিক্ষার এই দৈন্যদশা!

শ্রীলংকায় প্রায় ৯০ শতাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রীয় অর্থে চলে কিন্তু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক উন্নতমানের এবং শিক্ষকদের বেতন সরকারির চেয়ে অনেক বেশি। তাই বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সরকারি শিক্ষক বাগিয়ে নেয়। আমাদের দেশে যারা এমপিওভুক্ত শিক্ষক তারা সরকারি হতে চাচেছন আর যারা এমপিও-র বাইরে তারা চাচেছন এমপিওভুক্ত হতে। আসলে সরকারকে কি করতে হবে? শিক্ষকদের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কথা চিন্তা করলে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে জাতীয়করণ করা প্রয়োজন। আবার মানসম্মত শিক্ষা প্রদান করার কথা চিন্তা করলে শুধুমাত্র জাতীয়করণের মাধ্যমে যে সেটি সম্ভব নয় সেটিও একটি বাস্তবতা। তবে, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যারা ৯৭ শতাংশ এবং কোনভাবে রাষ্ট্রীয় সহায়তা না পাওয়া প্রতিষ্ঠান ৭৪ শতাংশ ।

অথচ এ প্রতিষ্ঠানগুলোই কিন্তু বিশাল সংখ্যক শিক্ষার্থীর শিক্ষাদানের দায়িত্বে নিয়োজিত। তারা অভুক্ত থেকে কিংবা অনিয়মিত বেতন পেয়ে কিভাবে শিক্ষায় নিজেদের আত্মনিয়োগ করবেন? আমরা কোনো সরকারকেই বিষয়টিকে সেভাবে ভাবতে দেখিনি। শুধু শিক্ষা উন্নয়নের ফর্দ শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা। দেশে শিক্ষার করুণ চিত্রের কথা শিক্ষা নিয়ে কাজ করা বা শিক্ষা সচেতন ব্যক্তিমাত্রই জানেন। কিন্তু কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান যখন তথ্য ও উপাত্তসহ শিক্ষার অনগ্রতির কারণ তুলে আনে তখন আরও অবাক হতে হয়। যেমন এই জরিপ! যেখানে ৭৪ শতাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রীয় কোনো ধরনের সহায়তা পায় না তাহলে এগুলোতে কি শিক্ষাদান করা হয় সেটি তো শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জানার কথা।

এখানে আর একটি বিষয় জড়িত। এই ৭৪ শতাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কতটা পরিকল্পিত এবং চাহিদা অনুযায়ী তৈরি করা হয়েছে। আমরা সরকারি প্রাথমিকের কথা জানি একটি বিদ্যালয়ে মাত্র তিনজন শিক্ষার্থীও আছে আবার তিন হাজারও আছে। এই একটিমাত্র চিত্র আমাদেরকে বলে দেয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কতটা অপারিকল্পিত, কতটা এলোমেলো অবস্থায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমরা এবার এসএসসি পরীক্ষায় দেখলাম কোথাও কোথাও সাত থেকে দশজন শিক্ষক আছেন শিক্ষার্থী আছেন দুজন, চারজন কিংবা পাঁচজন, তাদের সবাই আবার অকৃতকার্য হয়েছেন।

প্রাইমারিই হোক আর মাধ্যমিকই হোক, সরকারি হোক আর বেসরকারি একটা বিদ্যালয়ে যখন দশ বার কিংবা ৫০ শিক্ষার্থীও থাকে, সেখানে মানবসম্পদের কতটা অপচয় হচেছ সেই হিসেব কে রাখবেন? রাখার কথা জেলা এবং উপজেলা শিক্ষা অফিসের। কিন্তু এ জাতীয় হিসেব বা কথা বা আলোচনা আমরা কখনোই সেসব অফিসের মাধ্যমে দেখিনা বা জানতে পারিনা। আমরা জানেত পারি কিছু উৎসুক ও প্রকৃত পেশাদার শিক্ষা সাংবাদিকদের কাছ থেকে।

আমাদের শিক্ষক নেতাদের দেখা যায় বিভিন্ন দাবি দাওয়া নিয়ে আন্দোলন করতে কিন্তু তারা কখনোই কোনো স্টাডি বা জারিপ কিংবা গবেষণা নিয়ে জনসমক্ষে হাজির হোন না কিংবা মন্ত্রণালয়ের কাছে যান না। ইদানিং দেখছি শিক্ষক নেতারা ভাড়ায় মানবন্ধন ও সেমিনারে যোগ দেন, কারো পদত্যাগ দাবিও করেন টাকার বিনিময়ে। যেমন ৭৪ শতাংশ বিদ্যালয় যে সরকারি সুবিধাবঞ্চিত তাদের পড়াশোনার কি অবস্থা, শিক্ষাদানের পদ্ধতি, শিক্ষার্থী সংখ্যা ও শিক্ষক শিক্ষার্থী অনুপাত কেমন, এসব প্রতিষ্ঠানে কিভাবে শিক্ষক নিয়োগ হয়, নিয়োগকৃত শিক্ষকদের কত শতাংশ শিক্ষকতা করার উপযোগী, এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কতগুলো আসলে টিকিয়ে রাখা প্রয়োজন, কতগুলো মার্জ করা প্রয়োজন, কেন প্রয়োজন, এর ইম্পিলিকেশন কি? শিক্ষক সংগঠনগুলোর কাজ মূল কাজ ছিলো এগুলো। এগুলো যখন শিক্ষক সংগঠনগুলো করতে পারবে তখন তারা শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সমাজ থেকে বিভিন্ন স্বীকৃতি পাবেন। মন্ত্রণালয় বা মাউশি অধিদপ্তর এসব কাজ কখনোই করবে না। যে সেটআপে মন্ত্রণালয় এবং মাউশি অধিদপ্তর গঠিত তাতে আমরা তাদের কাছ থেকে কখনোই এসব আশাই করতে পারিনা।

তাই, আমরা বিকল্প হিসেবে দাবি করে আসছিলাম, শক্তিশালী একটা শিক্ষা কমিশন গঠন করা যায় কিনা। সেটি যেনতেন বা প্রচলিত পদ্ধতিতে কিছু সুপারিশ দেবে---এ ধরনের কমিশন হলে চলবেনা। এটা হতে হবে প্রকৃতই পেশাদার, প্রকৃতই মাঠ পর্যায়ের সাথে যাদের সঠিক যোগাযোগ আছে, যারা প্রকৃতঅর্থেই দেশের শিক্ষা নিয়ে চিন্তা করেন, জানেন এবং কাজ করেন। এখানে বিগ পজিশন দেখে মনোনয়ন দিলে সেটা হবে শুধু কাগুজে কমিশন। এই কাগুজে সুপারিশ যারা দেন তাদের দ্বারাই গঠিত হয় এসব কমিশন আর তাই আমাদের প্রশ্ন শুনতে হয় এজাতীয় বড় দায়িত্বশীলদের কাছ থেকে, ‘ বাংলাদেশে কি কোনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে? সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরাই কি এমপিও পান? এ জাতীয় আজগুবি কথা ও প্রশ্ন যারা জিজ্ঞেস করেন তাদের দ্বারাই দেখলাম শিক্ষার বড় বড় গবেষণা করানো হয়। কাজেই শিক্ষার এই দশা তো হবেই! এতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই।


মাছুম বিল্লাহ, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ